অর্থপাচার নিয়ে সংসদে আবারও উত্তাপ

0
76

বার্তা প্রতিবেদক: জাতীয় সংসদে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাপ ছড়ালো অর্থ পাচারের অভিযোগ। সোমবার সম্পূরক বাজেট পাসের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সদস্যরা অর্থ পাচারের অভিযোগ তোলেন। পাশাপাশি শেয়ারবাজারসহ আর্থিক খাতের নানা অনিয়ম নিয়ে কথা বলেন তারা। আগের দিন অর্থপাচার নিয়ে সোচ্চার হন সরকারি দলের সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ।

তবে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নতুন আইন প্রণয়নের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে নতুন ১৫টি আইন প্রণয়ন হবে।

এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘কালো টাকা বলতে কোনো টাকা নাই। টাকা সব বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা বিদেশ থেকে ফেরত আনেন। এখন আমেরিকা থেকে টাকা ফেরত আসছে। কেন আসতেছে? কারণ তারা জানেন এই দেশে যদি টাকা আনেন তাহলে হিসাব দিতে হবে না। শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করে অথবা কোনো সম্পদ কেনে তাহলে টেন পারসেন্ট দিয়ে এই টাকা লগ্নি করতে পারবেন। আমরা চাই আমাদের দেশের টাকা দেশে থাকুক। দেশের টাকা বিদেশে চলে যাবে আমরা কোনো সুযোগ দেবো না?’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয় বাংলাদেশের পরিবর্তে কানাডায় স্থাপনের প্রস্তাব করে ফিরোজ রশীদ বলেন, দুদকের হেড অফিস আপাতত বাংলাদেশে রাখার দরকার নাই। ওটা কানাডায় সৃষ্টি করুন। আরেকটি মালয়েশিয়ায় ব্রাঞ্চ করুন। একটি আমেরিকায় করুন, অস্ট্রেলিয়ায় করুন, দুবাই করুন। তাহলে বুঝতে পারবো সঠিক চিত্রটা কি।

তিনি বলেন, ‘আমি বলবো, ইতিমধ্যে হাইকোর্ট আমাদের বলে দিছেন যে আপনারা আমাদেরকে লিস্ট দেন কারা কারা বিদেশে বাড়ি করেছেন বেগম পাড়া বলেন, যে পাড়া বলেন। আমেরিকায় কারা বাড়ি করেছে, মালয়েশিয়ায় কারা বাড়ি করেছে লিস্ট দেন। সাম্প্রতিককালে গিয়ে দীর্ঘকাল যারা সেখানে বসবাস করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য করেন তারা তো সেখানে বাড়ি করবেন। কিন্তু সেই লিস্টটা কিন্তু বার বার দুদক দিতে পারে নাই। দুদক যায় আর আসে- এইভাবে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হবে, কিছুই হবে না।’

ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আর্থিকখাতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্ব খুব কঠিন। কিন্তু উনার কর্তৃত্ব অত্যন্ত দুর্বল। উনি কর্তৃত্ব অথরিটি খাটাতে পারেন না। ওনার যে মন্ত্রণালয় এর মধ্যেই উনি কর্তৃত্ব খাটান। কিন্তু বাইরে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আছে ব্যাংক এখানে ওনার কোনো কর্তৃত্ব নেই। অন্যান্য যে সিডিউল ব্যাংকগুলো আছে, লিজিং কোম্পানিগুলো আছে, ইন্স্যুরেন্সগুলো আছে কোনো জায়গায় যদি কর্তৃত্ব না থাকে অবাধে সব কিছু হবে। একটি ব্যাংক থেকে আরেকটি ব্যাংক টাকা নিচ্ছে। একটি ব্যাংকের ডাইরেক্টর অন্য ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছে। ওই ব্যাংকের ডাইরেক্টর এই ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছে। টাকাটা নিয়ে তারা হুন্ডি করে বিদেশে পাচার করতেছে। এভাবে তারা বহু টাকা, হাজার হাজার লক্ষ কোটি টাকা তারা বিদেশে পাচার করতেছে।’

জাতীয় পার্টির এই এমপি বলেন, ‘আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই যে পিকে হালদার উনি এতগুলো টাকা নিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি অডিট সেকশন আছে। তারা যদি সব সময় অডিট করতো তাহলে কিন্তু এইটা হতো না। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি অডিট করে ওই ব্যাংকগুলোকে, লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাহলে কিন্তু কেউ চুরি করার সুযোগ পায় না। চুরি করার সুযোগটা আমরা করে দিচ্ছি।’

এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির আরেক সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিবারের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জনগণের টাকার হরিলুট হচ্ছে। সংসদে ৩০০ জনের ঋণ খেলাপির তালিকা দেওয়া হলো। তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? বিদেশে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে চলে যাচ্ছে। ওভার আর আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে যাচ্ছে। এর বাইরে হুন্ডির পরিমাণ ধরলে আল্লাহ মাবুদ জানেন কত টাকা বিদেশে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে শেয়ার বাজার শুয়ে পড়ে। ৯৬ সালে, ২০০৯ সালে শুয়ে পড়লো। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বললেন, তিনি শেয়ারবাজার বোঝেন না। শেয়ার বাজার ফটকা বাজার। সেই অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট কথা বলতেন, দলের বিপক্ষে গেলেও বলতেন।”

মঞ্জুরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ছাঁটাই প্রস্তাব তোলার সময় বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, ‘স্কুলে অংকে তিনি ভালো ছাত্র ছিলেন। কিন্তু বাজেটের অংকের হিসাব মেলাতে পারছেন। ঘাটতি কোথায়? কোথা থেকে টাকা আনবে? প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। করোনাকালীন সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে করোনা নিয়ন্ত্রণে। না হলে প্রবাস আয়, গার্মেন্ট খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্যাতিত এতিমদের মত। দেখার কেউ নেই। লুটপাট হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে। কিছুই হয় না। শাস্তি হয় না।

আগের দিন রোববার সরকারি দলের সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, বড় বড় চোরদের দুর্নীতি, অর্থপাচারের মত কার্যক্রমে ঘৃণায়, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। এগুলোর বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা না বাড়ালে, দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না।

আলী আশরাফ বলেন, আমরা বাজেটতো দিচ্ছি। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য সদিচ্ছা থাকতে হবে। কিছু পাবার, খাবার বা প্রত্যাশার জন্য যুদ্ধ করিনি। লড়াই করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। সেই দেশে আজকে ঘৃণা, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। এত বড় বড় কিছু চোর, যাদের নাম ওঠে।

এসব অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের কষ্টে অর্জিত টাকা বিদেশে চলে যাবে, আপনাদের যেমন লাগে, আমারও লাগে। আমি অনিয়ম, বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। আমরা সবাই চাই, এগুলো বন্ধ করতে হবে। বন্ধ হচ্ছে। আগের মত অবস্থা নেই। আগে সিমেন্টের নাম করে বালি আসতো। একটার নাম করে আরেকটা আসতো। আন্ডারইনভয়েসিং, ওভারইনভয়েসিং আগের মত হয় না। একদম বন্ধ হয়ে গেছে বলবো না।

ওএস/আরপি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here